ঢাকা ১২:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা, অশ্রুসজল শেষ বিদায়

বিদ্রোহীর পাশে সমাহিত বিপ্লবী

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৭:৩৬:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 178

জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ওসমান হাদির জানাজায় মানুষের ঢল।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখভাগের যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আজ শনিবার বিকেলে বিদ্রোহী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে বেলা ৩টা ২ মিনিটে হাদির মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলে পৌঁছায়। হাদির মরদেহ কবরে শায়িত করা হয় ৩টা ২০মিনিটের দিকে। দাফন শেষে মোনাজাত পরিচালনা করেন ওসমান হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক।

 

জানাজাপূর্ব বক্তব্যে তিনি বলেন, তাঁর ভাই শরিফ ওসমান বিন হাদির ইচ্ছে ছিল শহীদ হওয়ার। তিনি বলেন, আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমার ভাই শহীদ হয়েছে, তার শহীদি তামান্না ছিল। হয়তো আল্লাহ তার শহীদি মৃত্যু নসিব করেছেন। এর আগে হাদি নিজেও চেয়েছিলেন শহীদি মৃত্যু। এক সংবাদ সম্মেলনে হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, আপনাকে যদি হত্যা করা হয়, কিন্তু সেই রক্তের বিনিময়ে শহীদি মৃত্যুতে যদি নতুন বাংলাদেশ গড়ে যেতে পারেন, আগামী এক হাজার বছর বাংলাদেশের মানুষ আপনার জন্য নামাজে প্রার্থনায় শুধু দোয়া করবে। অবশেষে আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে টানা ৮ দিনের  লড়াই শেষে দেশী-বিদেশি চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশজুড়ে। মুহূর্তেই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকাসহ সারা দেশ।

 

শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণে হাদির জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় ইমামতি করেন ওসমান হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। ওসমান হাদির জানাজায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অংশগ্রহণ করেন। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া মো. গোলাম পরওয়ার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ছিলেন।

 

এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ এই জানাজায় শরিক হন। জানাজাকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন এলাকা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

 

জানাজার আগে বক্তব্য দেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব জাবের ও ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। এসময় পুরো এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জানাজা শেষে লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে মিছিল করে জনতা রওনা হয় শাহবাগের দিকে।

 

পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী জানাজা বেলা ২টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা আড়াইটায় শুরু হয়। জানাজা উপলক্ষে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরা ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে পুরো এলাকা সুরক্ষিত রাখা হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, জানাজায় অংশগ্রহণকারীরা কোনো প্রকার ব্যাগ বা ভারী বস্তু ছাড়াই অংশগ্রহণ করেন এবং সংসদ ভবন এলাকায় ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

 

বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন জাতীয় কবির সমাধির পাশে হাদির কবর খননের কাজ শুরু হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তাঁকে কবির সমাধির পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

 

শরীফ ওসমান হাদি—শুধু কোনো ব্যক্তিনাম নন; তিনি বিপ্লবের এক জ্বলন্ত প্রতীক। অন্যায়কে প্রশ্ন করার, ফ্যাসিবাদের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ানোর এবং নির্ভীকচিত্তে সত্য উচ্চারণের এক সাহসী নাম। জুলাই বিপ্লবের অস্থির দিনগুলোতে যখন মানবিকতা ছাপিয়ে আতঙ্ক আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল মানুষের বিবেককে, তখন হাদি হয়ে উঠেছিলেন দৃঢ়তার অবয়ব। মঞ্চে কিংবা মাইকের মাইক্রোফোনের সামনে তার কণ্ঠে ছিল না বিন্দুমাত্র জড়তা। দৃষ্টিতে ছিল না অণু পরিমাণও ভয় বা সংশয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—সত্য বলার ঝুঁকি আছে ঠিকই, তবে নিশ্চুপ থাকার দায় আরও ভয়াবহ। আধিপত্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে চলার পথে অবিচল থেকে লালন করেছেন ন্যায়ের ওপর দাঁড়ানো এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই বজ্রকণ্ঠকে থামিয়ে দিয়েছে আততায়ীরা।

 

জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই দলে দলে মানুষ আসছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। দুপুর ১টার দিকেই প্রশস্ত ওই সড়ক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। তাদের কারো মাথায় ছিল জাতীয় পতাকা বাঁধা, কেউ আবার গায়ে জড়িয়েছিলেন পতাকা। অনেকে স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘আমরা সবাই হাদি হব যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’।

 

খামারবাড়ি গোল চত্বরের সামনে দিয়ে তাদের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ঢোকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কাউকে সন্দেহ হলে সেখানে তল্লাশি করা হচ্ছিল। তবে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে তল্লাশি করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।

 

জানাজার আগে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং হাদির জীবনী পড়ে শোনান।

 

পরে হাদির পরিবারের পক্ষে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আমরা এখানে কি কান্নার জন্য এসেছি? আমরা এখানে কীসের জন্য এসেছি? আমার ভাইয়ের রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য আজকে আমরা এই জানাজায় দাঁড়িয়েছি। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হাদির হত্যাকারী গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওসমান হাদিকে ১৬৮ ঘণ্টা আগে গুলি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে? আমরা মনে করছি, খুনি একজন নয়, পুরো একটা খুনি চক্র কাজ করেছে। খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারী, পুরো খুনি চক্রকে বিচারের আতায় আনতে হবে।

 

জাবের বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা (জাহাঙ্গীর আলম) ও সহকারী উপদেষ্টাকে (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদাবক্স চৌধুরী) জনসম্মুখে এসে জানাতে হবে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে। যদি না পারে, তাদের পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা ওসমান হাদির রক্তকে বৃথা যেতে দেব না। ওসমান হাদির রক্তের মাধ্যমে এ দেশে ইনসাফ কায়েম হবে। তবে কোনো ধরনের সহিংসতার উসকানিতে সাড়া না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে জাবের বলেন, ইনকিলাব মঞ্চ থেকে সব ধরনের সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তিনি বলেন, ওসমান হাদি লক্ষ্য কোটি তরুণের মধ্যে জীবিত থেকে যাবেন ইনশাআল্লাহ। জানাজা শেষে মিছিল নিয়ে শাহবাগে চলে যাবেন। দাফনের পর ওখানে আপনাদের সাথে কথা বলব।

 

জানাজার পূর্বে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, প্রিয় ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসি নাই এখানে। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছো। এবং চিরদিন, বাংলাদেশ যতদিন আছে, তুমি সকল বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে। এটা কেউ সরাতে পারবে না। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা আজকে তোমাকে বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি। তুমি যা বলে গেছ, সেটা যেন আমরা পূরণ করতে পারি। সেই ওয়াদা করার জন্য আমরা একত্র হয়েছি। সেই ওয়াদা শুধু আমরা নয়, পুরুষানুক্রমে বাংলাদেশের সব মানুষ পূরণ করবে। সেই ওয়াদা করার জন্যই আমরা তোমার কাছে আজকে এসেছি। সবাই মিলে, যে যেখানেই আছি, আমরা তোমার যে মানব প্রেম, তোমার যে ভঙ্গি মানুষের সঙ্গে উঠাবসা, তোমার যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সবাই প্রশংসা করছে, সেটা আমরা মনে প্রাণে গ্রহণ করছি। যেটা যেন আমাদের মনে সবসময় জাগ্রত থাকে, আমরা সেটা অনুসরণ করতে পারি।

 

ইউনূস বলেন, তুমি আমাদেরকে এমন এক মন্ত্র কানে দিয়ে গেছ, সেই মন্ত্র বাংলাদেশের কেউ কোনোদিন ভুলতে পারবে না। এবং এই মন্ত্র চিরদিন আমাদের কানের পাশে থাকবে। সে মন্ত্র বাংলাদেশের বড় মন্ত্র হয়ে আমাদের জাতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। তোমার মন্ত্র ছিল, ‘চল বীর উন্নত মমশীর’। এই উন্নত মমশীরের যে মন্ত্র তুমি দিয়ে গেছ, সেটা বাংলাদেশি সন্তানের জন্মলগ্ন থেকে যতদিন সে বেঁচে থাকবে, নিজের কাছে বলবে। ‘বল বীর চির উন্নত মমশীর’। আমাদের শির কখনো নত হবে না।

 

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রিয় হাদি, তুমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলে। এবং সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নির্বাচন কীভাবে করতে হয়, তারও একটা প্রক্রিয়া জানিয়ে গেছে আমাদেরকে। সেই প্রক্রিয়া যেন আমরা সবাই মিলে গ্রহণ করি, যে কীভাবে প্রচার প্রচারণা কার্য চালাতে হয়, কীভাবে মানুষের কাছে যেতে হয়, কীভাবে মানুষকে কষ্ট না দিয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে বিনীতভাবে মানুষের কাছে আসতে হয়, সবকিছু তুমি শিক্ষা দিয়ে গেছ। আমরা এই শিক্ষা গ্রহণ করলাম। আমরা এই শিক্ষা চালু করতে চাই। আমরা সবাই আমাদের জীবনে, আমাদের রাজনীতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই, যাতে হাদি আমাদের জীবনে স্পষ্টভাবে জাগ্রত থাকে। হাদি, তুমি হারিয়ে যাবে না। তুমি কোনোদিন কেউ তোমাকে ভুলতে পারবে না। তুমি যুগ যুগ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমাদেরকে তোমার মন্ত্র পুনঃপুনঃ যে মনে করিয়ে দেবে।

 

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা সেই মন্ত্র নিয়ে আজকে সামনের পথে এগিয়ে যাব। তোমাকে আমাদের সবার পক্ষ থেকে তোমার সঙ্গে ওয়াদা করলাম। আজকে তোমাকে আল্লাহর হাতে আমানত রেখে গেলাম। আমরা সবসময় তোমার কথা স্মরণ রেখে জাতির অগ্রগতির পথে চলতে থাকব।

 

এরপর বক্তব্য দেন হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। তিনিই হাদির জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। ওসমান হাদির রেখে যাওয়া আট মাসের শিশু সন্তানের কথা স্মরণ করে তার বড় ভাই বলেন, এই আট মাসের সন্তানকে তিনি রেখে গেছেন। সন্তানের নামকরণের আগে ওসমান হাদি আমাকে যা বলেছিলেন, সেই স্মৃতি আজ বারবার মনে পড়ছে। হাদি ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট, সে কথা তুলে ধরে আবু বকর বলেন, একটাই দাবি। সাত থেকে আট দিন হয়ে গেল, খুনি যদি পার পেয়ে যায়, এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু নেই। তারা কেমন করে গেল, এই প্রশ্ন জাতির কাছে রেখে গেলাম।

 

উপস্থিত সবার উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদি আর ফিরে আসবে না। ওসমান, তুমি দেখে যাও—এই লক্ষ লক্ষ তৌহিদি জনতা তোমার জন্য পাগল। তুমি আজ নেই, আমাদের পাগল বানিয়ে দিয়ে গেছ। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পর হাদির জানাজায় অংশ নেন সবাই।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবির সমাধিসৌধে দাফন পূর্বে সেখানে উপস্থিত আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, আজকে আমি সাধারণ মানুষের সাথে হাদির জানাজা পড়েছি। আজকে প্রধান উপদেষ্টা ডেকেছেন, আমি যাইনি। আল্লাহ হাদিকে শাহাদাতের জজবা হিসেবে কবুল করে নিয়েছেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত তৃতীয় শহীদ হিসেবে আল্লাহ কবুল করেছেন। আমি হাদিকে নিয়ে আমার মাকে শুইয়ে দিয়েছি, আজ আমি হাদিকে কবরে শুইয়ে দিতে এসেছি।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। দেশের জন্য তার যে ত্যাগ আল্লাহ তাআলা কবুল করুক। তার পরিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারিত পরিবারের অংশ। আমরা চূড়ান্তভাবে সম্মান জানাতে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে তাকে কবরস্থ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সন্তানকে বুকে নিয়েছে। মা তার ছেলেকে বা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে গ্রহণ করেছে।

 

দাফনের সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী এবং হাদির পরিবারের সদস্যরা।

 

এদিকে, ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর বিকেলে শাহবাগে জড়ো হতে থাকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্র জনতা। পরে বিকেল ৫ টার দিকে শাহবাগেও একই দাবি জানান আবদুল্লাহ আল জাবের। সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারী এবং পুরো চক্রকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং সহকারী উপদেষ্টা (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী) খোদা বখস চৌধুরী জনতার সম্মুখে এসে এই খুনের ব্যাপারে গত এক সপ্তাহে তাঁরা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন তা জনসম্মুখে জানাতে হবে।

 

জানাজার আগে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, যদি তাঁরা জানাতে না পারেন, তবে তাঁদের পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা ইনকিলাব মঞ্চ কোনোভাবেই ওসমান হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেব না।

 

ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, আমার ভাইয়ের রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য এ জানাজায় দাঁড়িয়েছি। শরিফ ওসমান হাদিকে এক সপ্তাহ আগে গুলি করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত তার খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কি খুনিদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে? তারা (সরকার) কি আমাদের জানিয়েছে খুনি কোন জায়গায় রয়েছে? এ সময় উপস্থিত জনতা না বলে চিৎকার করেন। জাবের বলেন, এখানে খুনি একজন নয়, পুরো একটি খুনি চক্র কাজ করেছে। খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, খুনের সহায়তাকারী এবং পুরো খুনি চক্রকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। জাবের বলেন, সিভিল, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা আওয়ামী লীগের দোসরদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হবে।

 

জাবের বলেন, এই রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে শরিফ ওসমান হাদির পরিবারের পাঁচ সদস্যদের (ভাই এবং বোন) যদি রক্ত লাগে তাঁরা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। তবুও এই খুনিদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।  কারও প্রচারণায় পড়ে সহিংসতায় না জড়ানোর আহ্বান জানান ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব। তিনি বলেন, আমরা ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানাব কখন, কি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ওসমান হাদিকে মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার তিনি মারা যান। তাঁর মরদেহ শুক্রবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আনা হয়। রাখা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের মর্গে। শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুতে শনিবার সারাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা, অশ্রুসজল শেষ বিদায়

বিদ্রোহীর পাশে সমাহিত বিপ্লবী

আপডেট সময় : ০৭:৩৬:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখভাগের যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আজ শনিবার বিকেলে বিদ্রোহী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে বেলা ৩টা ২ মিনিটে হাদির মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলে পৌঁছায়। হাদির মরদেহ কবরে শায়িত করা হয় ৩টা ২০মিনিটের দিকে। দাফন শেষে মোনাজাত পরিচালনা করেন ওসমান হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক।

 

জানাজাপূর্ব বক্তব্যে তিনি বলেন, তাঁর ভাই শরিফ ওসমান বিন হাদির ইচ্ছে ছিল শহীদ হওয়ার। তিনি বলেন, আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমার ভাই শহীদ হয়েছে, তার শহীদি তামান্না ছিল। হয়তো আল্লাহ তার শহীদি মৃত্যু নসিব করেছেন। এর আগে হাদি নিজেও চেয়েছিলেন শহীদি মৃত্যু। এক সংবাদ সম্মেলনে হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, আপনাকে যদি হত্যা করা হয়, কিন্তু সেই রক্তের বিনিময়ে শহীদি মৃত্যুতে যদি নতুন বাংলাদেশ গড়ে যেতে পারেন, আগামী এক হাজার বছর বাংলাদেশের মানুষ আপনার জন্য নামাজে প্রার্থনায় শুধু দোয়া করবে। অবশেষে আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে টানা ৮ দিনের  লড়াই শেষে দেশী-বিদেশি চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশজুড়ে। মুহূর্তেই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকাসহ সারা দেশ।

 

শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণে হাদির জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় ইমামতি করেন ওসমান হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। ওসমান হাদির জানাজায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অংশগ্রহণ করেন। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া মো. গোলাম পরওয়ার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ছিলেন।

 

এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ এই জানাজায় শরিক হন। জানাজাকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন এলাকা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

 

জানাজার আগে বক্তব্য দেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব জাবের ও ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। এসময় পুরো এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জানাজা শেষে লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে মিছিল করে জনতা রওনা হয় শাহবাগের দিকে।

 

পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী জানাজা বেলা ২টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা আড়াইটায় শুরু হয়। জানাজা উপলক্ষে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরা ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে পুরো এলাকা সুরক্ষিত রাখা হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, জানাজায় অংশগ্রহণকারীরা কোনো প্রকার ব্যাগ বা ভারী বস্তু ছাড়াই অংশগ্রহণ করেন এবং সংসদ ভবন এলাকায় ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

 

বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন জাতীয় কবির সমাধির পাশে হাদির কবর খননের কাজ শুরু হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তাঁকে কবির সমাধির পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

 

শরীফ ওসমান হাদি—শুধু কোনো ব্যক্তিনাম নন; তিনি বিপ্লবের এক জ্বলন্ত প্রতীক। অন্যায়কে প্রশ্ন করার, ফ্যাসিবাদের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ানোর এবং নির্ভীকচিত্তে সত্য উচ্চারণের এক সাহসী নাম। জুলাই বিপ্লবের অস্থির দিনগুলোতে যখন মানবিকতা ছাপিয়ে আতঙ্ক আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল মানুষের বিবেককে, তখন হাদি হয়ে উঠেছিলেন দৃঢ়তার অবয়ব। মঞ্চে কিংবা মাইকের মাইক্রোফোনের সামনে তার কণ্ঠে ছিল না বিন্দুমাত্র জড়তা। দৃষ্টিতে ছিল না অণু পরিমাণও ভয় বা সংশয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—সত্য বলার ঝুঁকি আছে ঠিকই, তবে নিশ্চুপ থাকার দায় আরও ভয়াবহ। আধিপত্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে চলার পথে অবিচল থেকে লালন করেছেন ন্যায়ের ওপর দাঁড়ানো এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই বজ্রকণ্ঠকে থামিয়ে দিয়েছে আততায়ীরা।

 

জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই দলে দলে মানুষ আসছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। দুপুর ১টার দিকেই প্রশস্ত ওই সড়ক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। তাদের কারো মাথায় ছিল জাতীয় পতাকা বাঁধা, কেউ আবার গায়ে জড়িয়েছিলেন পতাকা। অনেকে স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘আমরা সবাই হাদি হব যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’।

 

খামারবাড়ি গোল চত্বরের সামনে দিয়ে তাদের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ঢোকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কাউকে সন্দেহ হলে সেখানে তল্লাশি করা হচ্ছিল। তবে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে তল্লাশি করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।

 

জানাজার আগে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং হাদির জীবনী পড়ে শোনান।

 

পরে হাদির পরিবারের পক্ষে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আমরা এখানে কি কান্নার জন্য এসেছি? আমরা এখানে কীসের জন্য এসেছি? আমার ভাইয়ের রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য আজকে আমরা এই জানাজায় দাঁড়িয়েছি। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হাদির হত্যাকারী গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওসমান হাদিকে ১৬৮ ঘণ্টা আগে গুলি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে? আমরা মনে করছি, খুনি একজন নয়, পুরো একটা খুনি চক্র কাজ করেছে। খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারী, পুরো খুনি চক্রকে বিচারের আতায় আনতে হবে।

 

জাবের বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা (জাহাঙ্গীর আলম) ও সহকারী উপদেষ্টাকে (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদাবক্স চৌধুরী) জনসম্মুখে এসে জানাতে হবে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে। যদি না পারে, তাদের পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা ওসমান হাদির রক্তকে বৃথা যেতে দেব না। ওসমান হাদির রক্তের মাধ্যমে এ দেশে ইনসাফ কায়েম হবে। তবে কোনো ধরনের সহিংসতার উসকানিতে সাড়া না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে জাবের বলেন, ইনকিলাব মঞ্চ থেকে সব ধরনের সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তিনি বলেন, ওসমান হাদি লক্ষ্য কোটি তরুণের মধ্যে জীবিত থেকে যাবেন ইনশাআল্লাহ। জানাজা শেষে মিছিল নিয়ে শাহবাগে চলে যাবেন। দাফনের পর ওখানে আপনাদের সাথে কথা বলব।

 

জানাজার পূর্বে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, প্রিয় ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসি নাই এখানে। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছো। এবং চিরদিন, বাংলাদেশ যতদিন আছে, তুমি সকল বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে। এটা কেউ সরাতে পারবে না। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা আজকে তোমাকে বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি। তুমি যা বলে গেছ, সেটা যেন আমরা পূরণ করতে পারি। সেই ওয়াদা করার জন্য আমরা একত্র হয়েছি। সেই ওয়াদা শুধু আমরা নয়, পুরুষানুক্রমে বাংলাদেশের সব মানুষ পূরণ করবে। সেই ওয়াদা করার জন্যই আমরা তোমার কাছে আজকে এসেছি। সবাই মিলে, যে যেখানেই আছি, আমরা তোমার যে মানব প্রেম, তোমার যে ভঙ্গি মানুষের সঙ্গে উঠাবসা, তোমার যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সবাই প্রশংসা করছে, সেটা আমরা মনে প্রাণে গ্রহণ করছি। যেটা যেন আমাদের মনে সবসময় জাগ্রত থাকে, আমরা সেটা অনুসরণ করতে পারি।

 

ইউনূস বলেন, তুমি আমাদেরকে এমন এক মন্ত্র কানে দিয়ে গেছ, সেই মন্ত্র বাংলাদেশের কেউ কোনোদিন ভুলতে পারবে না। এবং এই মন্ত্র চিরদিন আমাদের কানের পাশে থাকবে। সে মন্ত্র বাংলাদেশের বড় মন্ত্র হয়ে আমাদের জাতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। তোমার মন্ত্র ছিল, ‘চল বীর উন্নত মমশীর’। এই উন্নত মমশীরের যে মন্ত্র তুমি দিয়ে গেছ, সেটা বাংলাদেশি সন্তানের জন্মলগ্ন থেকে যতদিন সে বেঁচে থাকবে, নিজের কাছে বলবে। ‘বল বীর চির উন্নত মমশীর’। আমাদের শির কখনো নত হবে না।

 

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রিয় হাদি, তুমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলে। এবং সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নির্বাচন কীভাবে করতে হয়, তারও একটা প্রক্রিয়া জানিয়ে গেছে আমাদেরকে। সেই প্রক্রিয়া যেন আমরা সবাই মিলে গ্রহণ করি, যে কীভাবে প্রচার প্রচারণা কার্য চালাতে হয়, কীভাবে মানুষের কাছে যেতে হয়, কীভাবে মানুষকে কষ্ট না দিয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে বিনীতভাবে মানুষের কাছে আসতে হয়, সবকিছু তুমি শিক্ষা দিয়ে গেছ। আমরা এই শিক্ষা গ্রহণ করলাম। আমরা এই শিক্ষা চালু করতে চাই। আমরা সবাই আমাদের জীবনে, আমাদের রাজনীতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই, যাতে হাদি আমাদের জীবনে স্পষ্টভাবে জাগ্রত থাকে। হাদি, তুমি হারিয়ে যাবে না। তুমি কোনোদিন কেউ তোমাকে ভুলতে পারবে না। তুমি যুগ যুগ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমাদেরকে তোমার মন্ত্র পুনঃপুনঃ যে মনে করিয়ে দেবে।

 

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা সেই মন্ত্র নিয়ে আজকে সামনের পথে এগিয়ে যাব। তোমাকে আমাদের সবার পক্ষ থেকে তোমার সঙ্গে ওয়াদা করলাম। আজকে তোমাকে আল্লাহর হাতে আমানত রেখে গেলাম। আমরা সবসময় তোমার কথা স্মরণ রেখে জাতির অগ্রগতির পথে চলতে থাকব।

 

এরপর বক্তব্য দেন হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। তিনিই হাদির জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। ওসমান হাদির রেখে যাওয়া আট মাসের শিশু সন্তানের কথা স্মরণ করে তার বড় ভাই বলেন, এই আট মাসের সন্তানকে তিনি রেখে গেছেন। সন্তানের নামকরণের আগে ওসমান হাদি আমাকে যা বলেছিলেন, সেই স্মৃতি আজ বারবার মনে পড়ছে। হাদি ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট, সে কথা তুলে ধরে আবু বকর বলেন, একটাই দাবি। সাত থেকে আট দিন হয়ে গেল, খুনি যদি পার পেয়ে যায়, এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু নেই। তারা কেমন করে গেল, এই প্রশ্ন জাতির কাছে রেখে গেলাম।

 

উপস্থিত সবার উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদি আর ফিরে আসবে না। ওসমান, তুমি দেখে যাও—এই লক্ষ লক্ষ তৌহিদি জনতা তোমার জন্য পাগল। তুমি আজ নেই, আমাদের পাগল বানিয়ে দিয়ে গেছ। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পর হাদির জানাজায় অংশ নেন সবাই।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবির সমাধিসৌধে দাফন পূর্বে সেখানে উপস্থিত আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, আজকে আমি সাধারণ মানুষের সাথে হাদির জানাজা পড়েছি। আজকে প্রধান উপদেষ্টা ডেকেছেন, আমি যাইনি। আল্লাহ হাদিকে শাহাদাতের জজবা হিসেবে কবুল করে নিয়েছেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত তৃতীয় শহীদ হিসেবে আল্লাহ কবুল করেছেন। আমি হাদিকে নিয়ে আমার মাকে শুইয়ে দিয়েছি, আজ আমি হাদিকে কবরে শুইয়ে দিতে এসেছি।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। দেশের জন্য তার যে ত্যাগ আল্লাহ তাআলা কবুল করুক। তার পরিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারিত পরিবারের অংশ। আমরা চূড়ান্তভাবে সম্মান জানাতে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে তাকে কবরস্থ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সন্তানকে বুকে নিয়েছে। মা তার ছেলেকে বা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে গ্রহণ করেছে।

 

দাফনের সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী এবং হাদির পরিবারের সদস্যরা।

 

এদিকে, ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর বিকেলে শাহবাগে জড়ো হতে থাকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্র জনতা। পরে বিকেল ৫ টার দিকে শাহবাগেও একই দাবি জানান আবদুল্লাহ আল জাবের। সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারী এবং পুরো চক্রকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং সহকারী উপদেষ্টা (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী) খোদা বখস চৌধুরী জনতার সম্মুখে এসে এই খুনের ব্যাপারে গত এক সপ্তাহে তাঁরা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন তা জনসম্মুখে জানাতে হবে।

 

জানাজার আগে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, যদি তাঁরা জানাতে না পারেন, তবে তাঁদের পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা ইনকিলাব মঞ্চ কোনোভাবেই ওসমান হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেব না।

 

ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, আমার ভাইয়ের রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য এ জানাজায় দাঁড়িয়েছি। শরিফ ওসমান হাদিকে এক সপ্তাহ আগে গুলি করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত তার খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কি খুনিদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে? তারা (সরকার) কি আমাদের জানিয়েছে খুনি কোন জায়গায় রয়েছে? এ সময় উপস্থিত জনতা না বলে চিৎকার করেন। জাবের বলেন, এখানে খুনি একজন নয়, পুরো একটি খুনি চক্র কাজ করেছে। খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, খুনের সহায়তাকারী এবং পুরো খুনি চক্রকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। জাবের বলেন, সিভিল, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা আওয়ামী লীগের দোসরদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হবে।

 

জাবের বলেন, এই রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে শরিফ ওসমান হাদির পরিবারের পাঁচ সদস্যদের (ভাই এবং বোন) যদি রক্ত লাগে তাঁরা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। তবুও এই খুনিদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।  কারও প্রচারণায় পড়ে সহিংসতায় না জড়ানোর আহ্বান জানান ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব। তিনি বলেন, আমরা ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানাব কখন, কি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ওসমান হাদিকে মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার তিনি মারা যান। তাঁর মরদেহ শুক্রবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আনা হয়। রাখা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের মর্গে। শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুতে শনিবার সারাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়।