ভোটের পর জাতীয় সরকার
- আপডেট সময় : ০১:৩৬:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 104
জনগণের সমর্থন নিয়ে ভবিষ্যতে ‘জাতীয় সরকারের’মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করতে চায় বিএনপি। অপরদিকে ২০০ আসনে এককভাবে বিজয়ী হলেও দেশের স্বার্থ ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ‘জাতীয় সরকারই’ গঠন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীও। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোও জাতীয় সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে কৌতূহল। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ঘুরেফিরে নানা প্রশ্ন আসছে সামনে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বড় দুটি দলের এমন ঘোষণা কেন? কাদের নিয়ে কিভাবে এ সরকার গঠন করা হবে? সেটা কি নির্বাচনে বিজয়ী সকল দলের আনুপাতিক হারে নাকি ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্যের ভিত্তিতে? তবে, সবকিছুই স্পষ্ট হবে জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার গঠন প্রক্রিয়া শুরু হলে।
ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ২০০ আসনে এককভাবে বিজয়ী হলেও দেশের স্বার্থ ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে জামায়াত জাতীয় সরকারই গঠন করবে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা জানান। জামায়াত আমির আশ্বস্ত করে বলেন, ক্ষমতায় এলে তার দল ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ’গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, আমরা কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ দেব না। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিত এবং দুর্নীতি রোধে আগামী পাঁচ বছর জাতীয় সরকার প্রয়োজন। জাতীয় সরকারে যুক্ত হওয়ার জন্য দুটি শর্তও উল্লেখ করেন-১. কেউ দুর্নীতি করবেন না এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না; ২. সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং বিচারব্যবস্থায় কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি জামায়াত নেতাদের বক্তব্য নিয়ে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এসবের অবসান ঘটাতেই তারেক রহমান সময়োপযোগী ও কৌশলী পরিকল্পনাও নিয়েছেন। রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এক ধরনের মনোমালিন্য তৈরি হয়েছে। এছাড়া জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলনসহ সমমনা ৮টি দল নিয়ে আসন সমঝোতা হয়েছে। সমমনা দলগুলো এক আসনে একটি বাক্সে ভোট নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। যে আসনে যে দলের যেই প্রার্থীর জিতে আসার সম্ভাবনা বেশি, সেই আসনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। অপরদিকে বিএনপিও চেষ্টা করছে মিত্রদের সাথে চলতি সপ্তাহেই আসন সমঝোতা শেষ করতে। আজ মঙ্গলবার ও আগামীকাল বুধবার মিত্রদের সাথে বসে আসন সমঝোতা শেষ করবে। আর এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির হাইকমান্ড থেকে জাতীয় সরকারের পরিকল্পনা নিয়েও কাজ চলছে। জনগণের সমর্থন নিয়ে বিএনপি ভবিষ্যতে জাতীয় সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করতে চায় বলে জানান তারেক রহমান।
গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথম জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর একটা জাতীয় সরকারের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসায় দেশ প্রথম দিন থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে একটা বিরাট অংশ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশ গঠনে কোনো অবদান রাখতে পারেনি। স্বাধীনতার পরপর জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে ব্যবহার না করে সেদিন যে সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, আগামী দিনে আমরা তার পুনরাবৃত্তি চাই না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সেবা আর অবদান দেশের কাজে লাগাতে বিএনপি উচ্চকক্ষসহ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত দেখতে চায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তারা জাতীয় সরকারের মধ্যে সমস্ত দলগুলোকে নিয়ে আসবেন, যারা বিএনপি সঙ্গে আন্দোলন করেছে তাদের নিয়ে দেশ পরিচালনা করবেন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও বিএনপি জাতীয় সরকার গঠন করবে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ৩১ দফার সংস্কার বাস্তবায়ন সবাইকে নিয়ে করতে চায় তার দল।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, নির্বাচনে জিতলে আমরা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করব। দেশে অনেক ছোট দল আছে, যাদের অনেক যোগ্য নেতা আছেন, তারা নির্বাচনে না জিতলেও আমরা তাদের জাতীয় সরকারে নেব। কারণ বিগত সরকার পতনের আন্দোলনে কারো ভূমিকা কম নয়।
এদিকে জাতীয় সরকার প্রশ্নে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বলেছেন, বিএনপি যদি উপলব্ধি করে, গত দেড় দশক যারা আন্দোলন করেছে, রক্ত দিয়েছে, তাদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে এবং তাদের মূল্যায়ন করবে, তবেই বিএনপির সঙ্গে জোট ও রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব হবে। অন্যথায় বিএনপির বাইরে বিকল্প জোট গঠিত হবে এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হবে।
জানা গেছে, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে ‘ঘষামাজা’করছে বিএনপি। তবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের জেরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ রূপরেখায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। ‘সরকার হটাও’আন্দোলন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন- এই দুটি বিষয় বাদ দেয়া হয়েছে জাতীয় সরকারের রূপরেখার মূল ফর্মুলা থেকে। এখন নির্বাচনের পর রাজপথের অংশীজনদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে বিএনপিতে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে এ নিয়ে সমমনা গণতন্ত্রকামী অন্যান্য দল ও সংগঠনের সাথে কথা বলে জাতীয় সরকার গঠন করবে বিএনপি।
বিএনপির সূত্রগুলো জানায়, জাতীয় সরকারের রূপরেখা তৈরি করতে ইতোমধ্যে দলের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতা অনেকদিন ধরেই কাজ করছেন। শিগগিরই সেখানে কিছু সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে জাতীয় সরকারের খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। এই খসড়া রূপরেখা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি পেশাজীবী, মানবাধিকার সংগঠনসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করবে বিএনপি। এরপর এ রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। তবে বিএনপির প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারের প্রধান কে হবেন, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আপাতত তারেক রহমানই জাতীয় সরকারের প্রধান নেতা হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে জামায়াতের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সরকার গঠন করলে জামায়াত কোনো দলকেই বাদ দেবে না। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং ফ্যাসিবাদের সঙ্গীদের বাদে সব দলকে নিয়ে সরকার গঠন করবে। এমনকি দুই শতাধিক আসনে বিজয়ী হলেও জাতীয় সরকারে বিএনপিকে রাখবে বলে জানা গেছে। জাতীয় সরকারের পাশাপাশি রাষ্ট্র পুনর্গঠনে পেশাজীবী মহলকে গুরুত্ব দেওয়া হবে সেই সরকারে। দলটির মতে, অন্তত আগামী পাঁচটা বছর স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি নির্মূলে জাতীয় সরকার প্রয়োজন। নির্বাচিত হলে সেই সরকারটাই গঠন করবে তারা।
জাতীয় সরকার প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, জনগণের সমর্থন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে সেটা হবে ইনসাফের সরকার। আমরা সমমনা ৮ দলের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সকল দলকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। এ ছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দফতরে সবশ্রেণীর-পেশার মানুষকে নিয়ে ইনক্লুসিভ রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।






















